রাজশাহী-নাটোর রুটে বাস মালিক-শ্রমিকদের অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে প্রায় ৩০ ঘণ্টা বাস চলাচল বন্ধ থাকা নিছক একটি পরিবহন সংকট নয়; এটি আমাদের গণপরিবহন ব্যবস্থার একটি গুরুতর দুর্বলতাকেই সামনে এনেছে। একটি বাস আটকে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে বিরোধের সূত্রপাত, তার পরিণতিতে রাজশাহী থেকে দেশের বিভিন্ন রুটে যাত্রী পরিবহন ব্যাহত হয়েছে। দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো মানুষ। শেষ পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমে বিরোধের অবসান এবং বাস চলাচল স্বাভাবিক হওয়া স্বস্তির খবর। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এমন পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো এবং ভবিষ্যতে তা ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা কোথায়?
গণপরিবহন কোনো ব্যক্তি, মালিক সমিতি কিংবা শ্রমিক সংগঠনের একক সম্পদ নয়। এটি জনগণের সেবা নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। রাজশাহী দেশের উত্তরাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগকেন্দ্র। এই শহর থেকে প্রতিদিন ঢাকা, চট্টগ্রাম, রংপুর, খুলনা, রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও অন্যান্য অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক মানুষ যাতায়াত করেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, রোগী ও স্বজন, পরীক্ষার্থী এবং জরুরি কাজে বের হওয়া মানুষ। ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ রুটে হঠাৎ বাস চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে তার অভিঘাত কেবল বাস টার্মিনালে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ছড়িয়ে পড়ে মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর।
সাম্প্রতিক ঘটনায় সেটিই দেখা গেছে। দীর্ঘ সময় কাউন্টারে অপেক্ষা করেও অনেকে গন্তব্যে যেতে পারেননি। কেউ ফিরে গেছেন বাড়িতে, আবার কেউ বাড়তি খরচ করে বিকল্প পরিবহনের আশ্রয় নিয়েছেন। যাঁদের জরুরি কাজ ছিল, তাঁদের দুর্ভোগ ছিল আরও বেশি। একটি পক্ষের সঙ্গে আরেক পক্ষের বিরোধের দায় সাধারণ যাত্রী কেন বহন করবেন ‘‘এ প্রশ্নের জবাব পরিবহন খাতের সংশ্লিষ্টদেরই দিতে হবে।‘‘
বাস মালিক-শ্রমিকদের মধ্যে স্বার্থের দ্বন্দ্ব নতুন কোনো বিষয় নয়। রুট পরিচালনা, বাস চলাচলের অনুমতি, যাত্রী পরিবহন, আয়-ব্যয়ের হিসাব, সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ কিংবা বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হতে পারে। কিন্তু কোনো বিরোধের সমাধান যদি হয় রাস্তায় বাস আটকে দিয়ে কিংবা গণপরিবহন বন্ধ করে, তাহলে সেটি নিছক সাংগঠনিক বিরোধ থাকে না; তা জনস্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থানে পরিণত হয়। আর এখানেই প্রশাসনের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি।
কোনো রুটে বিরোধের সূত্রপাত হওয়ার পর পরিস্থিতি যাতে দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও পরিবহন কর্তৃপক্ষকে সক্রিয় হতে হবে। একটি বাস আটকে দেওয়ার মতো ঘটনা কীভাবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বৃহত্তর পরিবহন সংকটে রূপ নেয়, তা সংশ্লিষ্টদের খতিয়ে দেখা দরকার। বিরোধ দেখা দেওয়ার পর আলোচনার উদ্যোগ যদি দ্রুত নেওয়া যেত, তাহলে হয়তো সাধারণ যাত্রীদের এতটা দুর্ভোগ পোহাতে হতো না।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ ধরনের ঘটনায় দায় নির্ধারণের একটি কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন যদি বেআইনিভাবে গণপরিবহন বন্ধ করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অন্যথায় একবার বাস বন্ধ করে দাবি আদায়ের সুযোগ তৈরি হলে ভবিষ্যতে অন্যরাও একই পদ্ধতি অনুসরণ করতে উৎসাহিত হবে।
গণপরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য মালিক, শ্রমিক ও প্রশাসনের মধ্যে নিয়মিত সমন্বয় থাকা জরুরি। বিরোধ সৃষ্টি হওয়ার পর সমাধানের পরিবর্তে বিরোধ যাতে ধর্মঘট, বাস বন্ধ কিংবা যাত্রী হয়রানিতে রূপ না নেয়, সে জন্য একটি স্থায়ী বিরোধ নিষ্পত্তি কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে মালিক-শ্রমিক ও প্রশাসনের প্রতিনিধিদের নিয়ে নিয়মিত সমন্বয় সভার আয়োজনও কার্যকর হতে পারে। আমরা মনে করি, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক উভয় পক্ষেরই দায়িত্বশীল আচরণ করা প্রয়োজন। নিজেদের ন্যায্য দাবি আদায়ের অধিকার অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু সেই অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের চলাচলের অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না। যাত্রীদের জিম্মি করে কোনো দাবি আদায় করার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।
একই সঙ্গে যাত্রীদের স্বার্থ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকেও আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। পরিবহন খাতের বিভিন্ন সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকলে তা একসময় বড় ধরনের সংকট তৈরি করে। তাই সমস্যা দেখা দেওয়ার পর তা সামাল দেওয়ার পরিবর্তে আগেই ঝুঁকি চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
রাজশিয়া-নাটোর রুটের সাম্প্রতিক সংকট শেষ পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমে মিটেছে এটি ইতিবাচক। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রেখে গেছে ঘটনাটি। যে বিরোধ আলোচনার টেবিলে বসে সমাধান করা সম্ভব, তার জন্য কেন হাজারো যাত্রীকে ভোগান্তির শিকার হতে হবে?
জনগণের অর্থে পরিচালিত ও জনগণের প্রয়োজন মেটানো গণপরিবহন কোনো পক্ষের স্বার্থের হাতিয়ার হতে পারে না। মালিক-শ্রমিকের বিরোধ থাকবে, মতপার্থক্য থাকবে; কিন্তু সেই বিরোধের বোঝা যাত্রীদের কাঁধে চাপানো যাবে না।
এখন প্রয়োজন সাময়িক সমঝোতার বাইরে গিয়ে স্থায়ী সমাধান। পরিবহন খাতের সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে কার্যকর সমন্বয়ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে পরিবহন বন্ধের প্রবণতার বিরুদ্ধে প্রশাসনকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। গণপরিবহন চলবে মানুষের জন্য মানুষকে জিম্মি করে নয়। রাজশাহী-নাটোরের সাম্প্রতিক ঘটনা যেন ভবিষ্যতের জন্য সেই শিক্ষা হয়ে থাকে।