সম্পাদকীয়

সম্পাদকীয়

উন্নয়নের নামে জনদুর্ভোগ আর কত?

রাজশাহীকে আধুনিক, যানজটমুক্ত ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে বহুদিন ধরে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ রেলক্রসিংগুলোতে চারটি ফ্লাইওভার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। প্রায় ৫৪০ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্প নিঃসন্দেহে বড় একটি উন্নয়ন উদ্যোগ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ‘‘এই উন্নয়ন কবে নাগরিকের স্বস্তিতে পরিণত হবে?’’

রাজশাহীকে আধুনিক, যানজটমুক্ত ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে বহুদিন ধরে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ রেলক্রসিংগুলোতে চারটি ফ্লাইওভার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। প্রায় ৫৪০ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্প নিঃসন্দেহে বড় একটি উন্নয়ন উদ্যোগ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ‘‘এই উন্নয়ন কবে নাগরিকের স্বস্তিতে পরিণত হবে?’’

নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও যখন একটি প্রকল্পের কাজ শেষ হয় না, তখন সেটিকে কেবল ‘কাজের ধীরগতি’ বলে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই। এটি প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, তদারকি, পরিকল্পনা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহির প্রশ্ন। রাজশাহীর চার ফ্লাইওভারের ক্ষেত্রেও সেই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে জোরালো হয়ে উঠেছে।

২০২৩ সালের শেষ দিকে শুরু হওয়া প্রকল্পগুলোর মধ্যে তিনটির কাজ চলতি বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সময়সীমা পার হয়ে গেছে। এখন কোনো কোনো প্রকল্পের জন্য ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় চাওয়া হচ্ছে, আবার সবচেয়ে বড় রেলগেট বিন্দুর মোড় ফ্লাইওভারের মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। অর্থাৎ যে অবকাঠামো দ্রুত নগরবাসীর চলাচল সহজ করার কথা ছিল, সেটিই এখন অনিশ্চিত সময়ের প্রকল্পে পরিণত হয়েছে।

সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, ফ্লাইওভার নির্মাণের সুফল পাওয়ার আগেই নগরবাসীকে এর ‘মূল্য’ দিতে হচ্ছে। সড়ক সংকুচিত হয়েছে, কোথাও খোঁড়াখুঁড়ি, কোথাও খানাখন্দ, কোথাও কাদা ও জলাবদ্ধতা। যানবাহনের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে। পথচারীদের ঝুঁকি বাড়ছে। ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন। একটি উন্নয়ন প্রকল্প যদি বছরের পর বছর মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে, তাহলে সেই প্রকল্প বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, কাজ শুরু হওয়ার পর ফ্লাইওভারগুলোর নকশা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে ল্যান্ডিংয়ের কারণে সড়ক সংকুচিত হয়ে ফ্লাইওভার চালুর পরও উল্টো যানজট তৈরি হতে পারে। যদি সত্যিই এমন সম্ভাবনা থাকে, তাহলে প্রকল্প গ্রহণের আগে সম্ভাব্য যানপ্রবাহ, ভবিষ্যৎ নগরায়ণ এবং সড়কের ধারণক্ষমতা যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছিল কি না? এই প্রশ্নের উত্তর অবশ্যই দিতে হবে।

একটি প্রকল্পের নকশা ভুল হলে শুধু নির্মাণ ব্যয় বাড়ে না; ভবিষ্যতে সেই ভুল সংশোধন করতে আরও অর্থ, সময় ও জনভোগান্তির প্রয়োজন হয়। তাই ‘আগে নির্মাণ, পরে চিন্তা’ ধরনের উন্নয়ন পরিকল্পনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। জনগণের অর্থে পরিচালিত প্রকল্পে প্রতিটি সিদ্ধান্ত হতে হবে তথ্য, গবেষণা ও বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে।

চারটি ফ্লাইওভারের ব্যয়ের হিসাবও যথেষ্ট বড়। রায়পাড়া ফ্লাইওভারে প্রায় ৮৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা, বন্ধগেটে প্রায় ৯৭ কোটি ৭০ লাখ, বিলশিমলায় প্রায় ৮৭ কোটি ৩০ লাখ এবং শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান চত্বরে প্রায় ২৭০ কোটি ৫১ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এত বিপুল অর্থ বিনিয়োগের পরও যদি নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ না হয়, তাহলে সময় বাড়ানোর কারণ, অতিরিক্ত ব্যয় এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার দায় কার তা স্পষ্ট হওয়া দরকার।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিভিন্ন সেবা সংস্থার সমন্বয়। গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, সড়কসহ নগর অবকাঠামোর সঙ্গে একটি বড় প্রকল্পের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। এসব বিষয় আগে থেকে সমন্বয় না করলে নির্মাণকাজ বারবার বাধাগ্রস্ত হবে এটাই স্বাভাবিক। তাই ভবিষ্যতে কোনো বড় প্রকল্প গ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত পরিকল্পনা বাধ্যতামূলক করা উচিত।

আমরা উন্নয়নের বিরুদ্ধে নই। বরং রাজশাহীর মতো দ্রুত বিকাশমান একটি নগরীর জন্য আধুনিক পরিবহন অবকাঠামো অপরিহার্য। কিন্তু উন্নয়ন মানে শুধু কংক্রিটের কাঠামো নির্মাণ নয়। উন্নয়ন মানে মানুষের সময় বাঁচানো, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ স্বাভাবিক রাখা এবং নগরজীবনকে সহজ করা।

তাই এখন প্রয়োজন নতুন করে দায় এড়ানোর চেষ্টা নয়; প্রয়োজন স্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা। কোন ফ্লাইওভারের কত শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে, কোনটির কী সমস্যা, সংশোধিত সময়সীমা কী এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের সম্ভাবনা আছে কি না,এসব তথ্য জনগণের সামনে প্রকাশ করা উচিত। একই সঙ্গে প্রকল্পের নকশা নিয়ে যেসব প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলো বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

নির্মাণকাজ চলাকালে নাগরিকদের দুর্ভোগ কমানোর দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। বিকল্প সড়ক সচল রাখা, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, নির্মাণস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক দ্রুত মেরামত করা জরুরি। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকার সামনে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে।

রাজশাহীর মানুষ উন্নয়ন চায়, কিন্তু তারা এমন উন্নয়ন চায় না যার জন্য বছরের পর বছর দুর্ভোগ পোহাতে হবে। তারা জানতে চায়, ৫৪০ কোটি টাকার প্রকল্পের সুফল তারা কবে পাবেন? তারা জানতে চায়, নির্ধারিত সময় কেন পার হলো? নকশায় যদি ত্রুটি থাকে, তার দায় কে নেবে? আর সময় ও ব্যয় বাড়লে সেই অতিরিক্ত বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণের ঘাড়েই কেন চাপবে?

কর্তৃপক্ষের মনে রাখা দরকার, উন্নয়ন প্রকল্প কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের একক বিষয় নয়; এটি জনগণের অর্থ, জনগণের সম্পদ এবং জনগণের ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। রাজশাহীর চার ফ্লাইওভার তাই দ্রুত শেষ করতে হবে কিন্তু শুধু দ্রুত নয়, সঠিকভাবে, নিরাপদভাবে এবং পরিকল্পিতভাবে। কাজের গতি বাড়ানোর পাশাপাশি মান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

উন্নয়নের নামে জনদুর্ভোগকে স্বাভাবিক বাস্তবতা হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না। উন্নয়ন তখনই সার্থক, যখন তার সুফল মানুষের জীবনে স্বস্তি হয়ে ফিরে আসে।