কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে শিশুসহ নয়জনের মৃত্যু নিছক একটি দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আরও উদ্বেগের বিষয়, নিহতদের আটজনই বাংলাদেশি নাগরিক। চিকিৎসা কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনে কলকাতায় যাওয়া এসব মানুষের নিরাপদে থাকার ন্যূনতম অধিকারটুকুও যদি নিশ্চিত না হয়, তাহলে এই মর্মান্তিক ঘটনা শুধু একটি পরিবারের শোক নয়—এটি নগর ব্যবস্থাপনা, হোটেল ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ এবং অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার গভীর দুর্বলতার প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে।
প্রাথমিকভাবে যে তথ্যগুলো সামনে এসেছে, তাতে আগুনের চেয়ে ধোঁয়াই প্রাণহানির বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ভবনের সংকীর্ণ চলাচলের পথ, ছোট কক্ষ, পর্যাপ্ত বিকল্প নির্গমন ব্যবস্থা না থাকা এবং অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে অভিযোগ—সবকিছু মিলিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, এমন একটি ভবনে কীভাবে একাধিক হোটেল ও গেস্টহাউস পরিচালিত হচ্ছিল। অগ্নিনিরাপত্তার ছাড়পত্র, জরুরি বহির্গমন পথ, পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম ও নিয়মিত নিরাপত্তা পরিদর্শন থাকলে পরিস্থিতি কি এতটা ভয়াবহ হতো—তদন্তকারীদের অবশ্যই সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, আগুন লাগার পর হোটেল কর্তৃপক্ষের কাউকে আবাসিকদের পাশে পাওয়া যায়নি। আতঙ্কিত মানুষ যখন বের হওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছিলেন না, তখন কেউ কেউ শৌচাগারে আশ্রয় নিয়ে জানালা ভেঙে বের হওয়ার চেষ্টা করেছেন—এই বিবরণই ভবনটির নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। একটি বৈধ আবাসিক হোটেলের ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এই ঘটনায় নিহত বাংলাদেশিদের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। বিদেশে অবস্থানরত একজন নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যেমন সংশ্লিষ্ট দেশের প্রশাসনের, তেমনি বিদেশে যাওয়া নাগরিকদের নিরাপদ আবাসন বেছে নেওয়া এবং জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে সচেতন করাও জরুরি। বিশেষ করে কলকাতার মতো বাংলাদেশিদের নিয়মিত যাতায়াতের একটি শহরে হোটেল ও আবাসিক ভবনের নিরাপত্তা মান নিয়ে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্যও সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
তবে এই মুহূর্তে আবেগের চেয়ে জরুরি হলো নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত। আগুনের সূত্রপাত কোথা থেকে, ভবনটির অনুমোদন কী ছিল, সেখানে পরিচালিত হোটেলগুলোর বৈধতা ছিল কি না, অগ্নিনিরাপত্তার ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল কি না, নিয়মিত পরিদর্শন হয়েছে কি না এবং নিরাপত্তা ঘাটতি থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেন ব্যবস্থা নেয়নি—প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর জনসমক্ষে আসতে হবে।
শুধু হোটেল মালিককে দায়ী করে তদন্ত শেষ করাও যথেষ্ট নয়। অনুমোদন প্রদানকারী সংস্থা, অগ্নিনিরাপত্তা পরিদর্শনকারী কর্তৃপক্ষ এবং নিয়মিত তদারকির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের দায়িত্বও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ একটি ভবনের নিরাপত্তা শুধু মালিকের ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়; রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি ব্যবস্থার কার্যকারিতার সঙ্গেও তা সরাসরি যুক্ত।
কলকাতার এ ঘটনা তাই একটি সতর্কবার্তা। ঘনবসতিপূর্ণ পুরোনো ভবন, সংকীর্ণ গলি, ছোট কক্ষ ও অতিরিক্ত বাণিজ্যিক ব্যবহার—এসব এলাকায় অগ্নিনিরাপত্তার সামান্য ঘাটতিও মুহূর্তে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। নিয়মের কাগজপত্র থাকলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না; নিয়ম বাস্তবে কার্যকর আছে কি না, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
নিহত নয়জনের প্রতি গভীর শোক এবং তাঁদের স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জানাই। একই সঙ্গে আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করি। এই প্রাণহানি যেন আরেকটি পরিসংখ্যান হয়ে হারিয়ে না যায়। তদন্তে দায়ীদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া এবং কলকাতার ঝুঁকিপূর্ণ হোটেল ও আবাসিক ভবনগুলোতে জরুরি অগ্নিনিরাপত্তা পরিদর্শন শুরু করা এখনই প্রয়োজন।
মানুষ হোটেলে যায় নিরাপদে থাকার জন্য, মৃত্যুফাঁদে আটকে পড়ার জন্য নয়। তাই কলকাতার এই অগ্নিকাণ্ডের সবচেয়ে বড় শিক্ষা একটাই—অগ্নিনিরাপত্তা কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি মানুষের জীবন রক্ষার মৌলিক শর্ত।