সম্পাদকীয়

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)

মানবতার পথেই হোক আমাদের অঙ্গীকার

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) মুসলিম বিশ্বের জন্য গভীর তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও জীবনাদর্শ স্মরণের এ দিনটি শুধু আনন্দ-উৎসবের নয়; বরং তাঁর দেখানো মানবতা, ন্যায়, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, ক্ষমা, সহনশীলতা ও শান্তির পথ নতুন করে উপলব্ধি করার দিন। বর্তমান সময়ে যখন সমাজে বিভাজন, হিংসা, অসহিষ্ণুতা ও স্বার্থপরতার প্রবণতা বাড়ছে, তখন মহানবী (সা.)-এর আদর্শ আমাদের জন্য আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) মুসলিম বিশ্বের জন্য গভীর তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন।
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) মুসলিম বিশ্বের জন্য গভীর তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। |রাজটাইমস

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) মুসলিম বিশ্বের জন্য গভীর তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও জীবনাদর্শ স্মরণের এ দিনটি শুধু আনন্দ-উৎসবের নয়; বরং তাঁর দেখানো মানবতা, ন্যায়, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, ক্ষমা, সহনশীলতা ও শান্তির পথ নতুন করে উপলব্ধি করার দিন। বর্তমান সময়ে যখন সমাজে বিভাজন, হিংসা, অসহিষ্ণুতা ও স্বার্থপরতার প্রবণতা বাড়ছে, তখন মহানবী (সা.)-এর আদর্শ আমাদের জন্য আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।

মহানবী (সা.) এমন এক সময়ে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন, যখন আরব সমাজে অন্যায়, অবিচার, বৈষম্য ও গোত্রীয় হিংসা ছিল প্রবল। কন্যাশিশুর প্রতি নির্মমতা, দুর্বলদের ওপর নির্যাতন, সুদ-শোষণ এবং সামাজিক বৈষম্য ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা। তিনি মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে নৈতিক ও মানবিক সমাজ গঠনের শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর আহ্বান ছিল মানুষে মানুষে ভেদাভেদ নয়, বরং তাকওয়া, ন্যায় ও মানবিকতার ভিত্তিতে সমাজ গড়ে তোলা।

আজকের পৃথিবীর দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রযুক্তি ও অর্থনীতিতে অভূতপূর্ব অগ্রগতি হলেও মানুষের মধ্যে শান্তি ও নিরাপত্তার সংকট কাটেনি। যুদ্ধ, সহিংসতা, ধর্মীয় বিদ্বেষ, জাতিগত সংঘাত, ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও উদ্বাস্তু সংকট বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষের জীবনকে বিপন্ন করছে। একই সঙ্গে পরিবার ও সমাজের ভেতরেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার ঘাটতি দৃশ্যমান। এমন বাস্তবতায় মহানবী (সা.)-এর শান্তি, সহমর্মিতা ও ক্ষমার শিক্ষা অনুসরণ করা সময়ের দাবি।

মহানবী (সা.) শুধু ইবাদতের শিক্ষা দেননি; মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কেমন হবে, প্রতিবেশীর অধিকার কী, এতিম-দরিদ্রের প্রতি দায়িত্ব কী, ব্যবসায় সততা কীভাবে বজায় রাখতে হবে—এসব বিষয়েও সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, প্রতিবেশী যেন তার দ্বারা কষ্ট না পায়। ব্যবসায় প্রতারণা ও মাপে কম দেওয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। এতিম, অসহায় ও দরিদ্র মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালনে উৎসাহ দিয়েছেন। অর্থাৎ তাঁর জীবনাদর্শের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে মানুষের অধিকার ও সামাজিক দায়িত্ব।

আমাদের সমাজে আজ দুর্নীতি, প্রতারণা, মিথ্যাচার, অন্যের অধিকার হরণ এবং দায়িত্বহীনতার যে চিত্র দেখা যায়, তা মহানবী (সা.)-এর আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালনের পাশাপাশি তাঁর নৈতিক শিক্ষাগুলো আমাদের ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে—সেটিই হওয়া উচিত আত্মসমালোচনার বিষয়।

বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে মহানবী (সা.)-এর জীবন একটি অনুকরণীয় আদর্শ হতে পারে। সততা, অধ্যবসায়, জ্ঞানচর্চা, দায়িত্ববোধ, সাহস, বিনয় এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসার যে শিক্ষা তাঁর জীবনে পাওয়া যায়, তা অনুসরণ করলে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ই উপকৃত হবে। ধর্মীয় মূল্যবোধকে কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জীবনের আচরণে প্রতিফলিত করা প্রয়োজন।

ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে জশনে জুলুশ, আলোচনা সভা, মিলাদ ও দোয়ার আয়োজন হয়। এসব আয়োজন মানুষের মধ্যে ধর্মীয় চেতনা জাগাতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর মূল সার্থকতা তখনই, যখন মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা আমাদের আচরণে প্রতিফলিত হবে। তাঁর প্রতি ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রকাশ হতে পারে তাঁর আদর্শকে জীবনে ধারণ করা এবং মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করা।

আজকের বাংলাদেশে শান্তি, সামাজিক সম্প্রীতি ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন অত্যন্ত গভীর। মত ও পথের ভিন্নতা থাকতেই পারে; কিন্তু সেই ভিন্নতা যেন বিদ্বেষ ও সংঘাতে পরিণত না হয়। মহানবী (সা.)-এর জীবন আমাদের শেখায়, মতভেদ ও প্রতিকূলতার মধ্যেও ন্যায়, ধৈর্য, সংযম ও মানবিকতা ধরে রাখা সম্ভব।

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) তাই কেবল স্মরণের দিন নয়—এটি আত্মশুদ্ধি ও অঙ্গীকারের দিন। আমরা যেন তাঁর শিক্ষা থেকে সততা, ন্যায়, সহমর্মিতা ও ক্ষমার শক্তি গ্রহণ করি। সমাজের দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়াই, অন্যায়কে প্রশ্রয় না দিই এবং মানুষের অধিকার রক্ষায় দায়িত্বশীল হই।

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে একটি শান্তিপূর্ণ, মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও সম্প্রীতিময় সমাজ গড়ে তোলাই হোক এবারের ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)-এর সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার। তাঁর জীবনাদর্শ আমাদের ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সত্যিকার অর্থে প্রতিফলিত হোক—এই হোক পবিত্র দিনের প্রত্যাশা।