শিক্ষা ও ক্যাম্পাস

যৌন হয়রানি-দুর্নীতির অভিযোগে রাবির দুই শিক্ষককে শাস্তি

রাবি প্রতিনিধি:
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

যৌন হয়রানি, প্রশ্ন ফাঁস, অযোগ্যতা, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) দুই শিক্ষককে শাস্তি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তাদের মধ্যে পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক প্রভাস কুমারকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।

অন্যদিকে চিত্রকলা, প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সুজন সেনকে পাঁচ বছরের জন্য সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পাশাপাশি সহযোগী অধ্যাপক পদ থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে অবনতি করা হয়েছে। দুজনই বিশ্ববিদ্যালয়ের আ'লীগ পন্থি প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।

গত বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেটের ৫৪৮তম সভায় পৃথকভাবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রোববার (১৬ আগস্ট) সন্ধ্যায় বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম ও রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ইফতিখারুল আলম মাসউদ।

চাকরিচ্যুত অধ্যাপক প্রভাস

যৌন হয়রানি ও একাডেমিক দুর্নীতির অভিযোগে পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক প্রভাস কুমারকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘অধ্যাপক প্রভাস কুমারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পর বিষয়টি তদন্তে দুটি কমিটি করা হয়েছিল। কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সিন্ডিকেট সভায় তার বিরুদ্ধে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ইফতিখারুল আলম মাসউদ বলেন, ‘তার (প্রভাস কুমার) নামে নারী হয়রানির অভিযোগ ছিল এবং প্রশ্ন ফাঁস-সংক্রান্ত অভিযোগও ছিল। ইতঃপূর্বে আমরা তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে যৌন নিপীড়ন সেল আছে, তাদের মাধ্যমে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী এরপর তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এরপর ১৩ তারিখের সিন্ডিকেটে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।’

এর আগে গত বছরের ৪ আগস্ট অধ্যাপক প্রভাস কুমারের বিরুদ্ধে নিজ বিভাগের এক ছাত্রীকে চেম্বারে ডেকে শারীরিক ও মানসিকভাবে লাঞ্ছিত এবং কুরুচিপূর্ণ প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় ১৩ আগস্ট বিভাগের সভাপতি বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন ওই শিক্ষার্থীর মা।

পরে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির তদন্তের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অধিকতর তদন্ত করে। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মুখে গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর তাকে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল।

সুজন সেনের পদাবনতি

অন্যদিকে, পছন্দের শিক্ষার্থীকে সুবিধা দেওয়াসহ অযোগ্যতা, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে চিত্রকলা, প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সুজন সেনকে পাঁচ বছরের জন্য সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাকে সহযোগী অধ্যাপক পদ থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে অবনতি করা হয়েছে।

রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ইফতিখারুল আলম মাসউদ বলেন, অযোগ্যতা, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে ড. সুজন সেনকে পাঁচ বছরের জন্য সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তাকে সহযোগী অধ্যাপক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে অবনতি করা হয়েছে। লেকচারার থেকে একজন শিক্ষক যখন সহকারী অধ্যাপক পদে উন্নীত হন, বর্তমানে তার পদ সেই পর্যায়ে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আগামী পাঁচ বছর পর তিনি সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগদানের যোগ্য হবেন। এরপর আরও চার বছর পর তিনি সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য আবেদন করতে পারবেন। অর্থাৎ তাকে মোট নয় বছর পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পাঁচ বছর তিনি কোনো ধরনের ইনক্রিমেন্টও পাবেন না।

এর আগে অযোগ্যতা, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে গত বছরের ২৫ আগস্ট ড. সুজন সেনকে বিভাগ থেকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন শিক্ষার্থীরা। একই বছরের ৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, ছাত্র উপদেষ্টা ও বিভাগের সভাপতির কাছে বিভিন্ন দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রমাণসহ প্রায় ২০০ পৃষ্ঠার লিখিত অভিযোগ দেন তারা।

অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত জরুরি সভায় ড. সুজন সেনকে বিভাগের সব কার্যক্রম থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে ১৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ড. সুজন সেনের আচরণ নৈতিক স্খলন হিসেবে প্রমাণিত হয়।

পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট-১৯৭৩-এর ৫৫(৩) ধারায় ড. সুজন সেনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীনকে আহ্বায়ক করে আরও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অপর সদস্য ছিলেন সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম-২ এবং ড. সুজন সেন কর্তৃক মনোনীত একজন প্রতিনিধি।

গত ৯ মার্চ অনুষ্ঠিত রাবি সিন্ডিকেটের ৫৩৭তম সভায় এ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ৫৪৮তম সিন্ডিকেট সভায় ড. সুজন সেনকে পাঁচ বছরের জন্য সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি এবং সহযোগী অধ্যাপক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে অবনতি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।