রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচনের পর প্রায় ১০ মাসে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে ৬৩ লাখ ৮৯ হাজার ৭৫৯ টাকা ব্যয় হয়েছে। এ সময়ে রাকসুর বিভিন্ন পদ ও বিভাগের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৯১ লাখ ৫৫ হাজার ৯৩৯ টাকা। অথচ এক বছরের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রথম অধিবেশনে রাকসুর জন্য মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
রাকসু কোষাধ্যক্ষ কার্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বরাদ্দ ও উত্তোলনের সঙ্গে প্রকৃত ব্যয়ের পার্থক্য রয়েছে। কয়েকটি কার্যক্রম চলমান থাকায় উত্তোলিত অর্থের কিছু অংশের ভাউচার এখনো জমা হয়নি। আবার কোনো কোনো কার্যক্রম শেষে অব্যয়িত অর্থ ফেরত দেওয়ার কথাও নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমে ‘রাকসুর সোয়া কোটি টাকা ও আম্মারদের ভাউচার সংকট’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশের পর রাকসুর আর্থিক কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। ওই প্রতিবেদনে রাকসুর তহবিল থেকে ১ কোটি ২৯ লাখ ১৪ হাজার ৬৮৯ টাকা বরাদ্দ এবং ৬১ লাখ ৫০ হাজার ৪৬৬ টাকার বিল-ভাউচার জমা না দেওয়ার দাবি করা হয়। পাশাপাশি জিএসসহ কয়েকজন নেতার নামে বিপুল অর্থের হিসাব না দেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়।
তবে রাকসু কোষাধ্যক্ষ কার্যালয়ের নথি ও সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য বলছে, গত ১০ মাসে অনুমোদিত বরাদ্দের পরিমাণ ৯১ লাখ ৫৫ হাজার ৯৩৯ টাকা এবং প্রকৃত ব্যয় ৬৩ লাখ ৮৯ হাজার ৭৫৯ টাকা। ফলে বরাদ্দকৃত অর্থের পুরোটা ব্যয় হয়নি।
বিভিন্ন পদে বরাদ্দ
হিসাব অনুযায়ী, রাকসুর ভিপির দাপ্তরিক খাতে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং সামগ্রিক খাতে ৯ লাখ ৯০ হাজার ৩২৪ টাকা বরাদ্দ ও উত্তোলন করা হয়েছে। জিএসের দাপ্তরিক খাতে ৩ লাখ ৭০ হাজার এবং সামগ্রিক খাতে ৯ লাখ ২৭ হাজার টাকা বরাদ্দ ও উত্তোলন হয়েছে। এজিএস খাতে বরাদ্দ ও উত্তোলন হয়েছে ৬০ হাজার টাকা।
ক্রীড়া বিভাগে ১৬ লাখ ৪২ হাজার ৬১০ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে উত্তোলন হয়েছে ৭ লাখ ৫৩ হাজার ৩৭০ টাকা। বিতর্ক ও সাহিত্য বিভাগে ১২ লাখ ৫০ হাজার ৭৬৫ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে উত্তোলন হয়েছে ৭ লাখ ৫২ হাজার ৭৬৫ টাকা।
সংস্কৃতি বিভাগে ১১ লাখ ৫ হাজার টাকা বরাদ্দের মধ্যে উত্তোলন হয়েছে ১০ লাখ ৮০ হাজার টাকা। মহিলা বিষয়ক বিভাগে ৩ লাখ ৫৩ হাজার ২৭৬ টাকা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগে ২ লাখ ৭ হাজার টাকা বরাদ্দ ও উত্তোলন করা হয়েছে।
তথ্য ও গবেষণা বিভাগে ৬ লাখ ৯৬ হাজার টাকা বরাদ্দের বিপরীতে উত্তোলন হয়েছে ২ লাখ ১০ হাজার টাকা। মিডিয়া ও প্রকাশনা বিভাগে ৮ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪৮ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে উত্তোলন হয়েছে ২ লাখ ৮ হাজার ৪৪৮ টাকা।
এ ছাড়া পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ বিভাগে ৮২ হাজার টাকা এবং কোষাধ্যক্ষ কার্যালয়ে ১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা বরাদ্দ ও উত্তোলন করা হয়েছে।
কে কী করলেন
১০ মাসে রাকসুর বিভিন্ন বিভাগ থেকে বেশ কিছু কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ভিপির উদ্যোগে বিশ্বকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট প্রদর্শনী, ‘রান উইথ রাকসু’ ও জুলাই জাদুঘর স্থাপন করা হয়েছে।
জিএসের উদ্যোগে রাকসু ও সিনেট হল প্রতিনিধি সম্মেলন এবং ভর্তি পরীক্ষার্থীদের জন্য অ্যাডমিশন বুথ স্থাপন করা হয়।
ক্রীড়া বিভাগ থেকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া ক্রিকেট ম্যাচ প্রদর্শনী, খেলোয়াড়দের ব্যাগ ও ট্রাভেল কিট প্রদান, জিমনেশিয়াম ও স্টেডিয়ামে পানির ফিল্টার স্থাপন, আন্তঃহল ক্রিকেট, ভলিবল ও হ্যান্ডবল প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।
বিতর্ক ও সাহিত্য বিভাগ থেকে বিভিন্ন সেমিনার, পাঠচক্র, বিতর্ক উৎসব, লেখন প্রতিযোগিতা ও প্রকাশনা বের করা হয়েছে। সংস্কৃতি বিভাগ থেকে বিজয় দিবস, বাংলা নববর্ষ, কাওয়ালি সন্ধ্যা, চলচ্চিত্র প্রদর্শনীসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়।
তথ্য ও গবেষণা বিভাগ থেকে রাকসু ভবনে ওয়াই-ফাই স্থাপন, এআইবিষয়ক সেমিনার, গবেষণা ও উচ্চশিক্ষা নিয়ে ওয়েবিনার, বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কোর্স ও আন্তর্জাতিক এডুকেশন এক্সপোর আয়োজন করা হয়।
মিডিয়া ও প্রকাশনা বিভাগ সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়, ইফতার, ফ্যাক্টচেকিং কর্মশালা ও ফটোগ্রাফি কনটেস্ট আয়োজন করে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগ থেকে সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়।
মহিলা বিষয়ক বিভাগ থেকে নারী উদ্যোক্তা মেলা, মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা, ক্যান্সার সচেতনতামূলক সেমিনার, ফার্স্ট এইড বক্স ও স্বাস্থ্যসামগ্রী বিতরণ এবং সাতটি একাডেমিক ভবনে স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন স্থাপন করা হয়েছে।
সমাজকল্যাণ বিভাগ থেকে ক্যারিয়ার ও মেন্টাল ওয়েলবিয়িং কর্মশালা, ক্লিন ক্যাম্পাস প্রজেক্ট, মশা নিধন, খাবার মনিটরিং ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়।
‘মাত্র ৬০ হাজার টাকা নিয়েছি’
রাকসু এজিএস সালমান সাব্বির বলেন, গত ১০ মাসে তিনি একবারই ৬০ হাজার টাকা উত্তোলন করেছেন। দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, “পুরো অর্থ এখনো খরচ হয়নি। তাই ভাউচার জমা দেওয়া হয়নি। দায়িত্বের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় ভাউচারসহ পূর্ণাঙ্গ হিসাব জমা দেওয়া হবে।”
‘৮ লাখের এখতিয়ার থাকলেও নিয়েছি ৩ লাখ’
রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, “৮ লাখ টাকার এখতিয়ার থাকলেও আমি উত্তোলন করেছি ৩ লাখ টাকা।”
রাকসু নেতারা বলেন, অনুমোদিত অর্থ একবারে সম্পূর্ণ ব্যয় হয় না। অনেক কর্মসূচির কাজ ধাপে ধাপে সম্পন্ন হয়। কাজ চলমান থাকায় সংশ্লিষ্ট ভাউচার পরবর্তী সময়ে জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আবার কাজ শেষে অব্যয়িত অর্থ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
তাদের দাবি, উত্তোলিত অর্থের পুরোটা ব্যয় হয়েছে কিংবা ব্যক্তিগতভাবে নেওয়া হয়েছে এমন ধারণা সঠিক নয়। রাকসুর আর্থিক কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট নথি ও অনুমোদনের ভিত্তিতে হিসাব যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।
শিক্ষা ও ক্যাম্পাস
রাকসুর ১০ মাসে ব্যয় ৬৪ লাখ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচনের পর প্রায় ১০ মাসে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে ৬৩ লাখ ৮৯ হাজার ৭৫৯ টাকা ব্যয় হয়েছে।