জাতীয়

৩৫ বছর পর সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আবারও রাষ্ট্রপতি পদে সরাসরি ভোটাভুটি হতে যাচ্ছে। আজ জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত হবে বহুল প্রতীক্ষিত ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হবেন দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি। তফসিল অনুযায়ী, আজ দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ কক্ষে ভোটগ্রহণ চলবে। ভোটগ্রহণ শেষে সংসদ ভবনেই বেসরকারিভাবে ফল ঘোষণা করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন। এরপর গেজেট প্রকাশের পর আগামীকাল বঙ্গভবনে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির শপথ নেওয়ার কথা রয়েছে।

শাহ্ সুফি মহিব্বুল আরেফিন
বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও ১১ দলীয় ঐক্যের কর্নেল (অব.) অলি আহমদ
বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও ১১ দলীয় ঐক্যের কর্নেল (অব.) অলি আহমদ |রাজটাইমস্

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আবারও রাষ্ট্রপতি পদে সরাসরি ভোটাভুটি হতে যাচ্ছে। আজ জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত হবে বহুল প্রতীক্ষিত ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হবেন দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি। জাতীয় সংসদে বিএনপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিজয় অনেকটাই নিশ্চিত বলে মনে করা হচ্ছে। তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ।

তফসিল অনুযায়ী, আজ দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ কক্ষে ভোটগ্রহণ চলবে। ভোটগ্রহণ শেষে সংসদ ভবনেই বেসরকারিভাবে ফল ঘোষণা করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন। এরপর গেজেট প্রকাশের পর আগামীকাল বঙ্গভবনে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির শপথ নেওয়ার কথা রয়েছে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানসহ সংসদ সদস্যরা ভোট দেবেন। অসুস্থতার কারণে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ভোট দিতে পারবেন না বলে জানা গেছে।

১৯৯১ সালের পর আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা

দেশে সর্বশেষ রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯১ সালে। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে পরাজিত করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এরপর অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনগুলোতে মূলত সরকারদলীয় প্রার্থী এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয়নি।

এবার ১১ দলীয় ঐক্য জোট নিশ্চিত পরাজয়ের সম্ভাবনা জেনেও নিজেদের প্রার্থী দেওয়ায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটের আয়োজন করতে হচ্ছে। ফলে সাড়ে তিন দশক পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে সংসদে তৈরি হয়েছে ভিন্ন এক রাজনৈতিক আবহ। নির্বাচন সামনে রেখে বুধবার জাতীয় সংসদ ভবনে সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে।

ভোট দেবেন ৩৪৯ সংসদ সদস্য

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে মোট ৩৫০টি আসনের মধ্যে একটি আসন বর্তমানে শূন্য। এর বাইরে সংরক্ষিত নারী আসন রয়েছে ৫০টি। সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেওয়ার যোগ্য সংসদ সদস্যের সংখ্যা ৩৪৯।

সংসদে দলভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, সংরক্ষিত আসনসহ বিএনপির সংসদ সদস্য ২৪৭ জন। জামায়াতে ইসলামীর ৭৭, স্বতন্ত্র ৮, এনসিপির ৮, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ৩ এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বিজেপি, গণসংহতি আন্দোলন, গণপরিষদ, খেলাফত মজলিস ও জাগপার একজন করে সংসদ সদস্য রয়েছেন।

ফলে সংখ্যার বিচারে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুলের জয় অনেকটাই নিশ্চিত। তবে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী থাকায় এবারের নির্বাচন রাষ্ট্রপতি পদে একটি প্রতিযোগিতামূলক ভোটের সুযোগ তৈরি করেছে।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কোনো সংসদ সদস্য ভোট দিলে তার সংসদ সদস্য পদ হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। ফলে ভোটের ফলাফলে দলীয় সিদ্ধান্তের প্রভাবও থাকবে স্পষ্টভাবে।

‘বিশ্ববাসী এ নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে’

নির্বাচনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে বলে বুধবার নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠুভাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

সিইসি বলেন, দেশে সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে। গণ-অভ্যুত্থানের পর একজন রাষ্ট্রপতি মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেছেন। এ কারণে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে বিশ্ববাসীরও আগ্রহ রয়েছে।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভোটগ্রহণের শুরুতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ও বিরোধীদলীয় নেতা ভোট দেবেন। তাদের ভোট দেওয়ার দৃশ্য বাংলাদেশ টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে।

যেভাবে ভোট দেবেন সংসদ সদস্যরা

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যালট পেপারে থাকবে দুটি অংশ—একটি মুড়ি এবং অন্যটি মূল ব্যালট অংশ। মুড়ি অংশে থাকবে ক্রমিক নম্বর, সংসদ সদস্যের নাম ও বিভক্তি নম্বর।

সংসদ সদস্য নির্ধারিত স্থানে পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করার পর ব্যালট পেপার গ্রহণ করবেন। ব্যালটের অপর অংশে থাকবে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নাম। প্রার্থীর নামের পাশে নির্ধারিত স্থানে সংসদ সদস্যকে নিজের পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করতে হবে। এরপর ব্যালট পেপারটি নির্ধারিত বাক্সে জমা দিতে হবে।

ভোটগ্রহণ শেষে গণনা সম্পন্ন করে সংসদ ভবনেই ফল ঘোষণা করা হবে।

পদ শূন্য হওয়ার পর দ্রুত নির্বাচন

গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেন। সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ পদত্যাগ বা অন্য কোনো কারণে শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হয়। সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই নির্বাচন আয়োজন করেছে নির্বাচন কমিশন। এর আগে গত ৬ আগস্ট ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে ইসি।

দীর্ঘ বিরতির পর এবার রাষ্ট্রপতি পদে দুই প্রার্থী থাকায় সংসদে ভোটের আয়োজন হচ্ছে। ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তা না থাকলেও ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোটই এবারের নির্বাচনকে আলাদা গুরুত্ব দিয়েছে। আজকের ভোট তাই শুধু একজন নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ইতিহাসে এটি দীর্ঘ বিরতির পর একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মুহূর্ত।