জাতীয়

ইসি ও দলীয়করণ নিয়ে আপত্তি

স্থানীয় নির্বাচন বর্জনের পথে জামায়াত জোট

রাষ্ট্রীয় সংস্কার বাস্তবায়ন, নির্বাচন কমিশনে (ইসি) দলীয় নিয়োগ বাতিল, সরকারি প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ বন্ধসহ বিভিন্ন দাবিতে বিএনপি সরকারের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট।

অনলাইন ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত

রাষ্ট্রীয় সংস্কার বাস্তবায়ন, নির্বাচন কমিশনে (ইসি) দলীয় নিয়োগ বাতিল, সরকারি প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ বন্ধসহ বিভিন্ন দাবিতে বিএনপি সরকারের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট। এসব দাবি পূরণ না হলে আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন বর্জনের কথাও ভাবছে জোটটি। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব মো. শামসুল আলমকে অপসারণ করা না হলে ইসি ঘেরাওয়ের মতো কঠোর কর্মসূচি দেওয়ারও প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন জোটের নেতারা। খবর টাইমস অব বাংলাদেশের।

জামায়াত জোটের এমন অবস্থানে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও তাদের সাবেক রাজনৈতিক মিত্রদের মধ্যে দূরত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জোটের নেতাদের অভিযোগ, প্রতিশ্রুত সংস্কার বাস্তবায়ন না করে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় লোক নিয়োগ এবং অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে সরকার জনগণের প্রত্যাশার বিপরীত পথে হাঁটছে।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সংস্কারের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, সেখান থেকে তারা একচুলও সরবেন না। রাজপথ ও সংসদ দুই জায়গাতেই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান তিনি।

অন্যদিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, সরকার ও বিরোধী দলের চিন্তাভাবনায় পার্থক্য থাকতেই পারে। বিরোধীদের শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অধিকার রয়েছে। তবে সব সমস্যার সমাধান সংসদের ভেতরে আলোচনার মাধ্যমে হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ইসিতে নিয়োগ নিয়ে আপত্তি

বিরোধী দলগুলোর সবচেয়ে বড় আপত্তি নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে মো. শামসুল আলমের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে। তাদের দাবি, আগামী নির্বাচন প্রভাবিত করতেই তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নির্বাচন কমিশনে শামসুল আলমকে নিয়োগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে সরকার নিরপেক্ষ নির্বাচন চায় না—এমন বার্তা পাওয়া যাচ্ছে। তাকে দ্রুত অপসারণ না করলে তারা কঠোর কর্মসূচিতে যাওয়ার কথা জানান।

এনসিপির সদস্য সচিব ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেনও এই নিয়োগ বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। তার অভিযোগ, ইসিতে নিজেদের লোক বসিয়ে বিএনপি আগামী নির্বাচন প্রভাবিত করতে চাইছে।

তবে বিএনপি দলীয় লোক নিয়োগের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। রুহুল কবির রিজভীর দাবি, সংবিধানের মধ্যে থেকেই ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন করা হবে এবং সরকার কোনো আইন ভঙ্গ করেনি।

সারা দেশে লংমার্চের প্রস্তুতি

সংস্কার ও সুশাসনের দাবিতে সংসদের পাশাপাশি রাজপথেও বড় কর্মসূচির প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট। গণভোটের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, জুলাই আন্দোলনের হত্যাকাণ্ডের বিচার, নিত্যপণ্যের দাম কমানো, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং প্রশাসনে দলীয়করণ বন্ধের দাবিতে আগামী ৫ সেপ্টেম্বর থেকে কর্মসূচি শুরু হবে।

প্রথম দিন ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম লংমার্চের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরজুড়ে দেশের চারটি বিভাগীয় শহরে লংমার্চ করবে জোট। কর্মসূচির শেষ ধাপে ১৪ নভেম্বর ঢাকায় বড় ধরনের মহাসমাবেশ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

নিজস্ব কর্মসূচি চালাবে এনসিপি

জোটের কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি নিজেদের দলীয় কর্মসূচিও চালিয়ে যাবে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির নেতারা জানিয়েছেন, জোটগত আন্দোলনের পাশাপাশি সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও অব্যাহত থাকবে।

জামায়াত জোট থেকে এনসিপি বেরিয়ে যাচ্ছে—এমন গুঞ্জন উড়িয়ে দিয়ে আখতার হোসেন বলেন, এ বিষয়ে দলের মধ্যে কোনো আলোচনা হয়নি। বরং জোটের যৌথ কর্মসূচি আরও জোরালো করার পক্ষেই তারা রয়েছেন।

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটেও নজর

সংস্কার ও নির্বাচন ইস্যুর পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটকেও আন্দোলনের অন্যতম ইস্যু হিসেবে সামনে আনছে জামায়াত জোট। নেতাদের দাবি, গ্যাসের সংকটে শিল্পকারখানা এবং বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছেন। এ পরিস্থিতিতে জনমনে তৈরি হওয়া অসন্তোষ আন্দোলনের পক্ষে জনসমর্থন বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

বিএনপি-জামায়াতের সম্পর্কে ভাঙন

দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্কে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর। রাষ্ট্রীয় সংস্কার, ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ ও গণভোটের ফল বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য ক্রমেই প্রকাশ্য হয়।

সংবিধান সংস্কার কাউন্সিল, বিভিন্ন অধ্যাদেশ অনুমোদন ও বাতিল এবং সংসদীয় বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েও দুই দলের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। একপর্যায়ে সংসদে হট্টগোল ও বৈঠক বর্জনের ঘটনাও ঘটে।

১৯৯৯ সালে জোটবদ্ধ হওয়ার পর প্রায় ২৫ বছর একসঙ্গে রাজনৈতিক পথ চললেও ২০২৪ সালের পর সেই সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল দেখা দেয়। ২০২৫ সাল থেকে দুই দল কার্যত পৃথক রাজনৈতিক অবস্থান নেয়।

সর্বশেষ নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছে। অন্যদিকে ৭৭টি আসন পাওয়া জামায়াত-এনসিপি জোট সংসদে প্রধান বিরোধী দলের অবস্থানে রয়েছে।