নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ছয় মাসে দেশের অর্থনীতির ৩১টি প্রধান সূচকের মধ্যে ১৯টিতেই অবনতি হয়েছে। এ সময়ে দেশের তিনটি প্রধান শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এতে চাকরি হারিয়েছেন ৬১ হাজার ৮৮১ শ্রমিক।
সোমবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) কার্যালয়ে আয়োজিত ‘সরকারের ছয় মাস: একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া সংলাপে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য পর্যালোচনাটি উপস্থাপন করেন। অনুষ্ঠানে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান ও অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন।
সিপিডির পর্যালোচনায় বলা হয়, প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভসহ ১২টি সূচকে অগ্রগতি হলেও মূল্যস্ফীতি, মাথাপিছু ঋণসহ ১৯টি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে অবনতি হয়েছে। বিশেষ করে বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন ও রাজস্ব আদায়ের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
বিনিয়োগে স্থবিরতা, বন্ধ ৯৫ কারখানা
সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী—এই তিন শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এর ফলে ৬১ হাজার ৮৮১ জন কর্মসংস্থান হারিয়েছেন।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ফেব্রুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলার প্রবৃদ্ধিও ইতিবাচক থেকে নেতিবাচক হয়েছে। কমেছে নিট বিদেশি বিনিয়োগও।
শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক অবস্থায় চলে যাওয়াকে ‘শঙ্কাজনক’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বেসরকারি বিনিয়োগ দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত এখনো দেখা যাচ্ছে না।
রিজার্ভ বাড়াকে সবসময় অর্থনীতির সুস্থতার লক্ষণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় আমদানি কমছে এবং এর প্রভাবে রিজার্ভ বাড়ছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
রাজস্ব আদায়েও চাপ
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রায় ৪২ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে। ফলে বর্তমান রাজস্ব আদায় পরিস্থিতিকেও ‘উদ্বেগজনক’ বলে মনে করছে সিপিডি।
অর্থনীতি ও সুশাসনে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি
সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়ন তুলে ধরে ড. দেবপ্রিয় বলেন, নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রধান দুটি প্রত্যাশা ছিল—অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু ছয় মাসের পর্যালোচনায় এ দুই ক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি দেখা যায়নি।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থা, অনাদায়ী ঋণ, অর্থপাচার ও রাজস্ব ঘাটতির মতো বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। তবে এসব মোকাবিলা করে অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত গতি দেখা যায়নি।
সরকারকে ‘আড়াই-তলা’ বললেন দেবপ্রিয়
সরকারের কাঠামো নিয়েও মন্তব্য করেন ড. দেবপ্রিয়। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিভিন্ন পদমর্যাদার বিশেষ সহকারীদের সমন্বয়ে গঠিত বর্তমান সরকারকে তিনি ‘আড়াই-তলা সরকার’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
তিনি বলেন, সরকারের চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বেশি জনপ্রিয়। প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক সাহসের সঙ্গে দলের নেতাকর্মীদের সঠিক পথে পরিচালনা এবং আমলাদের যথাযথভাবে কাজে লাগানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
ছয় মাসের সরকারের সামগ্রিক মূল্যায়নে তিনি বলেন, ‘দিতে চাই এ, কিন্তু টানে তো বি-এর দিকে।’
বেতন কাঠামোর সিদ্ধান্তে দেরি নিয়ে সতর্কতা
সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে দেরি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ড. দেবপ্রিয়। তিনি বলেন, বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখলে সমস্যা কমবে না; বরং যত দেরি হবে, পরিস্থিতি তত জটিল হবে।
আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় ধাপে ধাপে বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া যেত উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুরুতেই ২০ থেকে ২৫ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা দিয়ে পরবর্তী সময়ে বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য সময় নেওয়া হলে তা কার্যকর সিদ্ধান্ত হতে পারত।