প্রফেসর ড. এম সাইদুর রহমান খান বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মন্ডলীর অন্যতম সদস্য, তথ্য ও গবেষণা উপ-কমিটির সভাপতি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য, যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাই কমিশনার, ওয়ান এলেভেন সময়কালের প্রতিবাদী কন্ঠসর, তৎকালীন ফখরুদ্দিন-মঈনউদ্দিন সরকার কর্তৃক নির্যাতনের শিকার ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বীজ বপনের অন্যতম ব্যাক্তিত্ব ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দের ৬ অক্টোবর পাবনা জেলার বড় নওগাঁ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা চায়েন উদ্দিন ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষক এবং মা তৈয়বুন নেছা ছিলেন গৃহিণী। চার ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ। খুব অল্প বয়সে ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় তিনি বাবাকে হারান।
এম. সাইদুর রহমান খানের স্ত্রী কুমু খান একজন স্কুল শিক্ষিকা ছিলেন। দাম্পত্য জীবনে তাদের দুই কন্যা ও এক পুত্র সন্তানের জনক। বড় কন্যা সিরাজুম মুনিরা খান সিমকি, উনার স্বামী ডঃ এএইচএম রহমতুল্লাহ ইমন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হতে পরিসংখ্যানে প্রথম শ্রেনীতে প্রথম স্থান অধিকার করে অনার্স ও মাষ্টার্স ডিগ্রী অর্জন করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।
পরবর্তীতে কমনওয়েলথ স্কলারশিপ নিয়ে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় হতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে আমেরিকার বল স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের গানিতিক বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর হিসেবে কর্মরত আছেন। ছোট কন্যা কাশফি রহমান খান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিষয়ে হতে অনার্স ও মাষ্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। উনার স্বামী ড নাজমুস সাদাত খান পিয়াস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে অর্থনীতিতে অনার্স ও লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় হতে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তিতে জার্মানির মুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয় হতে পিএইচডি ও আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় হতে পোস্ট ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে বিশ্ব ব্যাংকে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে আমেরিকাতে কর্মরত আছেন। তার দুই কন্যা বর্তমানে স্বামীসহ আমেরিকাতে বসবাস করছেন। একমাত্র পুত্র জার্মানির এক বিশ্ববিদ্যালয় হতে অর্থনীতিতে পি এইচ ডি করছেন।
প্রফেসর ডঃ এম সাইদুর রহমান খান অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত নিজ গ্রামে থেকেই পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে ঠাকুরগাঁও চলে যান। সেখানে ঠাকুরগাঁও হাইস্কুল (বর্তমানে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়) হতে ১৯৬৩ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করেন এবং রাজশাহী বোর্ডে ষষ্ঠ স্থান লাভ করে বোর্ড স্টান্ড করেন। এরপর তিনি পাবনার এডওয়ার্ড কলেজ হতে ১৯৬৫ সালে প্রথম বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৬৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগ হতে অনার্সে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৯৬৯ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগ হতে এম এস সি তে প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান লাভ করে উক্ত বিভাগেই শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তিনি ১৯৭৭ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় হতে পি এইচ ডি ডিগ্রি লাভ করেন।
সাইদুর রহমান খান দেশে এবং বিদেশে বিভিন্ন সময়ে তার গবেষণা কর্ম চালিয়ে গেছেন। তিনি লন্ডনের ব্রুনেল বিশ্ববিদ্যালয়, সুইডেনের চালমার্স প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও চীনের ছিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট পরবর্তী গবেষণা সম্পন্ন করেন। তিনি সুইডেনের উপাসালা ও গোথেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়, চীনের ছিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইটালির ত্রিয়েস্তে নগরীতে অবস্থিত ওঈঞচ তে উচ্চতর গবেষণা করেন। তার গবেষণার ক্ষেত্র মূলত পাতলা ঝিল্টি (থিন ফ্লিম) ও সৌরশক্তি (সোলার এনার্জি) কেন্দ্রিক। তার তত্ত্বাবধানে বেশ কয়েকজন গবেষক পিএইচডি উপাধি অর্জন করেছেন। ১৯৭০ সালের ১লা জুলাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পদার্থ বিজ্ঞান ও ইলেকট্রনিক্স বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তীতে ১৯৮০-৮২ সাল পর্যন্ত জাম্বিয়ার লুসাকাতে অবস্থিত জাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ১৯৮২-৮৪ সাল পর্যন্ত নাইজেরিয়ার আহমাদ বেল্টু বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। ১৯৮৬-৮৯ পর্যন্ত তিনি তার নিজ বিভাগ পদার্থ বিজ্ঞান ও ইলেকট্রনিক্স বিভাগ এর সভাপতি ও মাদার বক্স হলের প্রভোস্টের দায়িত্ব পালন করেন।
এছাড়াও তিনি ১৯৮৭ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য এবং ১৯৮৯ সালে সিনেট সদস্য ছিলেন। ১৯৯৭ সাল থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য এবং ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত উপাচার্যের দায়িত্ব¡ পালন করেন। উল্লেখ্য তিনি উপ-উপাচার্য থাকাকালীন ১৯৯৮ সালে স্বাধীনতার পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। ২০১২ তে ফলিত পদার্থ বিজ্ঞান ও ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ হতে অবসর গ্রহণের পর বর্তমানে রাজশাহীতে বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের উপদেষ্টা মন্ডলীর অন্যতম সদস্য ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা উপ কমিটির সভাপতি।
২০০৯-২০১২ সাল পর্যন্ত তিনি যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের হাই কমিশনার এবং আয়ারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত হিসেবে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৯ সালে একুশে ফেব্রুয়ারিকে ইউনেস্কো "আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস" হিসেবে ঘোষণা করে। এতে প্যারিসে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের একজন সদস্য হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
প্রফেসর এম সাইদুর রহমান খান ৩৫ টির মত দেশ ভ্রমণ করেছেন এবং বিভিন্ন দেশে ২০ টির মত আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশগ্রহণ করেছেন।
দেশ-বিদেশ মিলিয়ে এ পর্যন্ত প্রায় ৫০ টি জার্নালে তার বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশ পেয়েছে। বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত "তড়িৎ চুম্ববকীয় তত্ত্ব" এবং "পালস ও সুইচিং বর্তনী" পাঠ্যপুস্তক দুইটির তিনি যুগ্ন লেখক। ওয়ান ইলেভেনের পরে ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিন সরকার কর্তৃক জননেত্রী শেখ হাসিনা সহ আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের উপর যে নির্যাতন নেমে এসেছিল তার প্রতিবাদের অন্যতম ব্যক্তিত্ব ছিলেন প্রফেসর এম সাইদুর রহমান খান। তারই প্রেক্ষাপটে ২০০৭ সালে ২০-২৪ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সঙ্ঘটিত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যৌথবাহিনী তাঁকে গ্রেফতার করে। দশ দিনের রিমান্ড সহ অমানুষিক নির্যাতন শেষে প্রায় সাড়ে তিন মাস কারাগারে বন্দি থাকার পর ৪ ডিসেম্বর ২০০৭ সালে আদালতের রায়ে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে মুক্তি পান। সেসব দিনের তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁর রচিত "অন্ধকারায় বন্দি বিবেক" বই ২০০৮ সালে প্রকাশিত হয়। এছাড়াও অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২১ তে "বিলেতের একাল- সেকাল এবং কূটনীতির স্বাদ" নামক আরেকটি বই প্রকাশিত হয়।
এই নির্মোহ, নির্লোভ, নিরহংকার, দুরদর্শী, আত্মপ্রচারবিমুখ ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় প্রফেসর ড. এম সাইদুর রহমান খান স্যার এর আজ জন্মদিন। এই জন্মদিনে স্যারকে প্রাণ ঢালা শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
লেখক-মো. মোফাজ্জেল হক
সদস্য, তথ্য ও গবেষনা উপ কমিটি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।