রাজশাহী থেকে ঢাকায় যেতে সময় বাঁচাতে আকাশপথকে বেছে নেন অনেক যাত্রী। কিন্তু সেই আকাশপথেই এখন দেখা দিয়েছে সিট সংকট ও বাড়তি ভাড়ার বিড়ম্বনা। পর্যাপ্ত ফ্লাইট না থাকা, শেষ মুহূর্তে টিকিট না পাওয়া এবং চাহিদার সময়ে ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়ছেন রোগী, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও পর্যটকরা। বিশেষ করে জরুরি প্রয়োজনে ঢাকায় যেতে হলে অনেক যাত্রীকে বাধ্য হয়ে গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা।
রাজশাহী-ঢাকা রুটে নভোএয়ারের ফ্লাইট বন্ধ হওয়ার পর বর্তমানে মূলত ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে যাত্রীদের। ফলে প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি ফ্লাইটের বিকল্পও সীমিত হয়েছে। কোনো ফ্লাইটের আসন পূর্ণ হয়ে গেলে পরবর্তী ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া অনেকের সামনে আর কোনো উপায় থাকে না। এ সুযোগে চাহিদার সময়ে টিকিটের দাম বেড়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ যাত্রীদের।
নিয়মিত বিমানযাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় রাজশাহী-ঢাকা রুটে ইকোনমি ক্লাসের টিকিট প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যেত। বর্তমানে বিভিন্ন সময়ে সর্বনিম্ন ভাড়া প্রায় ৫ হাজার ৭০০ টাকা থেকে শুরু হয়ে ৬ হাজার, ৮ হাজার এমনকি ১১ হাজার টাকারও বেশি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে যাত্রার সময় যত ঘনিয়ে আসে, টিকিটের দাম তত বাড়ার অভিযোগ করছেন যাত্রীরা।
রাজশাহী-ঢাকা রুটের নিয়মিত যাত্রী আবুল কালাম আজাদ বলেন, রাজশাহীতে বিমানের যাত্রীর কোনো সংকট নেই। সকাল, দুপুর ও বিকেলে পর্যাপ্ত ফ্লাইট থাকলে প্রতিটি ফ্লাইটের আসনই পূর্ণ হবে। কিন্তু সিট কম থাকায় জরুরি প্রয়োজনে, বিশেষ করে রোগীদের, ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা বা তারও বেশি দামে টিকিট কিনতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, অন্যান্য ব্যস্ত রুটে একাধিক এয়ারলাইন্স থাকায় যাত্রীরা বিকল্প পান। কিন্তু রাজশাহী রুটে প্রতিযোগী কমে যাওয়ায় সেই সুযোগ নেই। ফলে চাহিদা বাড়লেই টিকিটের দামও বাড়ছে।
চিকিৎসার প্রয়োজনে নিয়মিত ঢাকায় যাতায়াতকারী ডা. আলমগীর হোসেন বলেন, আগে তুলনামূলক কম দামে বিমানে যাতায়াত করা যেত। এখন অনেক সময় ৫ হাজার ৭০০ থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে। জরুরি প্রয়োজনে শেষ মুহূর্তে টিকিট কাটলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়।
তার মতে, এ রুটে ফ্লাইট বাড়ানো জরুরি। কারণ যাত্রীর চাহিদা রয়েছে, কিন্তু সে অনুযায়ী আসন ও ফ্লাইটের সংখ্যা নেই।
ফ্লাইট কমায় বাড়ছে চাপ
বর্তমানে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স রাজশাহী-ঢাকা রুটে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করছে। অন্যদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে এই রুটে সেবা দিচ্ছে। ফলে কোনো দিন যাত্রীর চাপ বেড়ে গেলে দ্রুত টিকিট সংকট তৈরি হচ্ছে।
যাত্রীদের অভিযোগ, অন্তত এক সপ্তাহ আগে টিকিট বুকিং না করলে পছন্দের সময়ের ফ্লাইট পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। চিকিৎসার মতো জরুরি প্রয়োজনে আগে থেকে ভ্রমণ পরিকল্পনা করা সম্ভব না হওয়ায় রোগী ও স্বজনদের বিড়ম্বনাও বাড়ছে।
পর্যটনেও প্রভাব
বিমানভাড়ার ঊর্ধ্বগতির প্রভাব পড়ছে রাজশাহীর পর্যটন খাতেও। রাজশাহী শহরের ঐতিহাসিক স্থাপনা, পুঠিয়া রাজবাড়ি, বরেন্দ্র অঞ্চল ও বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা দেখতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পর্যটকরা আসেন। দ্রুত যোগাযোগের জন্য অনেকেই বিমানকে বেছে নেন।
রাজশাহী জিরো পয়েন্টের স্বর্ণা হোটেলের মালিক শফিকুল ইসলাম বলেন, আগে রাজশাহীতে পর্যটকের চাপ তুলনামূলক বেশি ছিল। বর্তমানে পর্যটক একেবারে বন্ধ না হলেও সংখ্যা কিছুটা কমেছে। ঢাকা-রাজশাহী রুটে বিমানের ভাড়া বেড়ে যাওয়ার প্রভাব হোটেল ব্যবসাতেও পড়ছে।
বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের কর্মকর্তা রফিক বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের প্রত্ননিদর্শন দেখতে আসেন। বিমানের টিকিটের দাম বাড়লে পর্যটকের সংখ্যা কমতে পারে। এতে শুধু পর্যটন নয়, স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
নভোএয়ার সরে যাওয়ার পর প্রতিযোগিতা কমেছে
নভোএয়ার রাজশাহী-ঢাকা রুট থেকে সরে যাওয়ার পর প্রতিযোগিতার ঘাটতি আরও স্পষ্ট হয়েছে বলে মনে করছেন যাত্রীরা। একটি রুটে একাধিক এয়ারলাইন্স নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করলে যাত্রীদের বিকল্প বাড়ে। একই সঙ্গে আসনসংখ্যা বাড়ায় চাহিদার তুলনায় সরবরাহের ঘাটতিও কিছুটা কমে।
যাত্রীদের অভিযোগ, বর্তমানে সীমিত সংখ্যক ফ্লাইটের ওপর নির্ভরতা তৈরি হওয়ায় চাহিদার সময়ে টিকিট পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে এয়ারলাইন্সগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত মুনাফা করছে—এমন অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলোর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কারণ, টিকিটের দাম নির্ধারণে আসনপ্রাপ্যতা, বুকিংয়ের সময়, ভাড়ার শ্রেণি, পরিচালন ব্যয় ও যাত্রী চাহিদাসহ বিভিন্ন বিষয় ভূমিকা রাখে।
জরুরি রোগীরাই বেশি বিপাকে
রাজশাহী ও আশপাশের জেলার অনেক রোগী উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার বিভিন্ন বিশেষায়িত হাসপাতালে যান। জরুরি রোগীদের ক্ষেত্রে দ্রুত ঢাকায় পৌঁছানো গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিমানের টিকিট না পাওয়া কিংবা অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে অনেকেই সড়ক ও রেলপথের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন।
রাজশাহী থেকে ঢাকায় সড়কপথে যেতে দীর্ঘ সময় লাগে। ফলে গুরুতর রোগী, ব্যবসায়ী কিংবা স্বল্প সময়ের কাজে ঢাকায় যাওয়া যাত্রীদের জন্য আকাশপথের গুরুত্ব অনেক বেশি।
ফ্লাইট বাড়ানোর দাবি
যাত্রীদের দাবি, রাজশাহী-ঢাকা রুটে ফ্লাইট সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন এয়ারলাইন্সকে এই রুটে আসতে উৎসাহিত করতে হবে। এয়ার অ্যাস্ট্রাসহ অন্য দেশীয় এয়ারলাইন্স নিয়মিত সেবা চালু করলে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং যাত্রীদের বিকল্প তৈরি হবে বলে মনে করছেন তারা।
আব্দুল হাকিম নামে এক নিয়মিত যাত্রী বলেন, আগে বিমানের সংখ্যা বেশি ছিল এবং ভাড়াও তুলনামূলক কম ছিল। নভোএয়ার সরে যাওয়ার পর টিকিটের দাম বেড়েছে। ভাড়া বাড়লেও সে অনুযায়ী সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। তাই এই রুটে ফ্লাইট বাড়ানোর পাশাপাশি ভাড়া যৌক্তিক পর্যায়ে রাখার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক কামরুজ্জামান বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট কাজ, ক্লাস, ভাইভা ও মডারেশনের জন্য নিয়মিত ঢাকা-রাজশাহী আকাশপথে যাতায়াত করেন। তিনি বলেন, সম্প্রতি এ রুটে যাত্রীদের বিড়ম্বনা বেড়েছে এবং টিকিটের দামও অনেকটাই বেশি।
তিনি বলেন, ভাড়া ও সেবার বিষয়টি পর্যবেক্ষণে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। যাত্রীসংখ্যা, আসনপ্রাপ্যতা, টিকিটের মূল্য ও বুকিংয়ের ধরন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হলে প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা সম্ভব হবে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে শাহ মখদুম বিমানবন্দর, রাজশাহীর বন্দর ব্যবস্থাপক মোছা. দিলারা পারভীন বলেন, নভোএয়ার নিজেদের ফ্লাইট গুটিয়ে নিয়েছে। এরপর ফ্লাইটের সংখ্যা কমে যাওয়ায় যাত্রীদের চাপ ও টিকিটের চাহিদা বেড়েছে। এর প্রভাব ভাড়ার ওপর পড়েছে।
তিনি বলেন, টিকিটের দাম বাড়ানো বা কমানো বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের হাতে নেই। কোনো এয়ারলাইন্স এই রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করতে চাইলে প্রয়োজনীয় অনুমোদনের বিষয়টি দেখা হবে।
নতুন কোনো এয়ারলাইন্স এই রুটে আসছে কি না—এ বিষয়ে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের কোনো পরিকল্পনা তাঁর জানা নেই বলেও জানান তিনি।
রাজশাহী-ঢাকা রুটে যাত্রী চাহিদা থাকার পরও ফ্লাইট ও আসনসংখ্যার ঘাটতি দীর্ঘদিন চলতে থাকলে এর প্রভাব শুধু যাত্রীদের ভোগান্তিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; চিকিৎসা, ব্যবসা, শিক্ষা ও পর্যটনসহ রাজশাহীর সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও এর প্রভাব পড়তে পারে। তাই দ্রুত ফ্লাইট সংখ্যা বাড়ানো এবং টিকিটের মূল্য ও আসনপ্রাপ্যতার বিষয়ে কার্যকর নজরদারি এখন সময়ের দাবি।
রাজশাহী
রাজশাহী-ঢাকা বিমানে চড়া ভাড়া, ফ্লাইটও কমেছে
রাজশাহী থেকে ঢাকায় যেতে সময় বাঁচাতে আকাশপথকে বেছে নেন অনেক যাত্রী। কিন্তু সেই আকাশপথেই এখন দেখা দিয়েছে সিট সংকট ও বাড়তি ভাড়ার বিড়ম্বনা। পর্যাপ্ত ফ্লাইট না থাকা, শেষ মুহূর্তে টিকিট না পাওয়া এবং চাহিদার সময়ে ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়ছেন রোগী, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও পর্যটকরা।