রাজশাহী মহানগরে আইন অমান্যকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে ট্রাফিক পুলিশ। মামলা ও জরিমানার পাশাপাশি অবৈধ যানবাহন আটকের সুযোগ থাকলেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ডাম্পিং স্টেশনের সংকট।
আরএমপির ৩৫ বছরের যাত্রায় এখনো গড়ে ওঠেনি ট্রাফিক বিভাগের জন্য স্থায়ী ও পর্যাপ্ত ডাম্পিং স্টেশন। ফলে জায়গার অভাবে অনেক সময় আটক করা সম্ভব হচ্ছে না আইন অমান্যকারী যানবাহন। মামলা বা জরিমানা করে ছেড়ে দেওয়ার পর একই গাড়ি ফের সড়কে নামছে।
১৯৯২ সালের ১ জুলাই চারটি থানা নিয়ে যাত্রা শুরু করে রাজশাহী মহানগর পুলিশ (আরএমপি)। বর্তমানে ১২টি থানা ও বিভিন্ন বিশেষায়িত ইউনিট নিয়ে মহানগর পুলিশের কার্যক্রম বিস্তৃত প্রায় ৪৭২ বর্গকিলোমিটার এলাকায়। সময়ের সঙ্গে বেড়েছে যানবাহনের সংখ্যা ও ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব। তবে সেই তুলনায় গড়ে ওঠেনি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো।
ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, আইন অমান্যকারী যানবাহন আটক করার পর নিরাপদে সংরক্ষণ করা পুলিশের দায়িত্ব। কিন্তু পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় একসঙ্গে বেশি গাড়ি আটক করা সম্ভব হয় না। ফলে অভিযান পরিচালনার সময় অনেক ক্ষেত্রেই আগে ভাবতে হয়, আটক করা গাড়ি কোথায় রাখা হবে।
ট্রাফিক পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ১০০টি গাড়ির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন থাকলেও ২০টি গাড়ি রাখার জায়গা থাকলে ১০০টি গাড়ি আটক করা সম্ভব নয়। জায়গার সংকটে অনেক সময় মামলা বা জরিমানা করে গাড়ি ছেড়ে দিতে হয়।
বর্তমানে হেলেনাবাদ এলাকায় সরকারি কোয়ার্টারের পাশে ছোট একটি জায়গা অস্থায়ীভাবে ডাম্পিং হিসেবে ব্যবহার করছে ট্রাফিক বিভাগ। তবে জায়গাটি পূর্ণাঙ্গ ডাম্পিং স্টেশনের বিকল্প নয়। এটি গণপূর্ত অধিদপ্তরের (পিডব্লিউডি) কোয়ার্টারের অংশ হওয়ায় জায়গাটি ছেড়ে দেওয়ার জন্য একাধিকবার চিঠিও দেওয়া হয়েছে। বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় আপাতত জায়গাটি ব্যবহারের অনুরোধ জানিয়েছে ট্রাফিক বিভাগ।
গত ৩ আগস্ট আরএমপির ট্রাফিক বিভাগ ও থানা পুলিশের সমন্বয়ে বিশেষ অভিযানে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর বিভিন্ন ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগে ৩৮টি মামলা করা হয়। একই সঙ্গে ট্রাক, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার, ইজিবাইক, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলসহ ২৫টি যানবাহন আটক করা হয়।
ট্রাফিক কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ডাম্পিং স্টেশন না থাকায় অভিযানেও অগ্রাধিকার ঠিক করতে হয়। বেশি ঝুঁকি তৈরি করা যানবাহনগুলো আগে আটক করা হলেও অন্য অনেক যানবাহনের ক্ষেত্রে মামলা বা জরিমানা করে ছেড়ে দিতে হয়। এতে একই যানবাহন আবারও আইন ভঙ্গের সুযোগ পায়।
ডাম্পিং স্টেশনের সংকটের প্রভাব পড়ছে নগরের যানজট ও সড়ক নিরাপত্তাতেও। সাহেববাজার, লক্ষ্মীপুর, মনিচত্বর, কাদিরগঞ্জ, রেলগেট ও তালাইমারী এলাকায় অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ ও যত্রতত্র পার্কিংয়ে বাড়ছে ভোগান্তি। পাশাপাশি বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
রাজশাহী জেলা ও মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে জেলায় ১৩৫টি এবং মহানগরে ৩৪টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ১৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে মামলা হয়েছে ১৬৯টি। মোট দুর্ঘটনার প্রায় অর্ধেক মোটরসাইকেল সংশ্লিষ্ট। এছাড়া প্রায় ৪০টি দুর্ঘটনা ঘটেছে ট্রাক বা ডাম্প ট্রাকের কারণে।
‘নিরাপদ সড়ক চাই’ রাজশাহী জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. আমানুল্লাহ বিন আখতার আবিদ বলেন, অতিরিক্ত অবৈধ যানবাহন, চালকদের অসাবধানতা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়া দুর্ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। ট্রাফিক পুলিশের জন্য আলাদা ডাম্পিং স্টেশন না থাকায় তাদের কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। রাজশাহীতে একটি ডাম্পিং স্টেশন হলে আইন অমান্যকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
রাজশাহী মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. নূর আলম সিদ্দিকী বলেন, মহানগরের আয়তন ও যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে। এ অবস্থায় ট্রাফিক বিভাগের জন্য একটি স্থায়ী ও নিরাপদ ডাম্পিং স্টেশন অত্যন্ত জরুরি। সম্ভব হলে মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় এলাকাভিত্তিক ডাম্পিং স্টেশন করা দরকার। অন্তত একটি পর্যাপ্ত জায়গাসম্পন্ন স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশন হলেও পুলিশের কার্যক্রম অনেক সহজ হবে।
রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির বলেন, ডাম্পিং স্টেশন তৈরি হলে পুলিশের অভিযান সহজ হওয়ার পাশাপাশি যানজট, অবৈধ পার্কিং ও সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তিনি বলেন, “অটো যেহেতু কোনো রেজিস্ট্রেশন বা চেসিস নম্বর নেই, সেখানে মামলা করার কোনো সুযোগ নেই। তবে আটক করে ডাম্পিংয়ে পাঠালে অবৈধ অটোরিকশা কমে আসবে।”
তিনি আরও বলেন, ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণে সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে, যাতে রাজশাহী মহানগর ট্রাফিক পুলিশের অধীনে একটি স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণের ব্যবস্থা করা যায়।