স্পেশাল ফিচার

রাজশাহী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ঘোড়ার গাড়ি

সময়ের পরিবর্তনে অটোরিকশা, সিএনজি, মোটরসাইকেলসহ আধুনিক যানবাহনের দাপটে সেই ঐতিহ্য এখন হারিয়ে যেতে বসেছে।

সোহরাব হোসেন সৌরভ, রাজশাহী
আধুনিক যানবাহনের দাপটে হারিয়ে যেতে বসা একটি ঘোড়ার গাড়ি।
আধুনিক যানবাহনের দাপটে হারিয়ে যেতে বসা একটি ঘোড়ার গাড়ি। |ছবি: রাজ টাইমস

একসময় গ্রামবাংলার মেঠোপথে ঘোড়ার গাড়ির ছুটে চলার দৃশ্য ছিল নিত্যদিনের। বিয়ে, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা দূরের পথ—সবখানেই ছিল ঘোড়ার গাড়ির কদর। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে অটোরিকশা, সিএনজি, মোটরসাইকেলসহ আধুনিক যানবাহনের দাপটে সেই ঐতিহ্য এখন হারিয়ে যেতে বসেছে।

তবুও বাপ-দাদার পেশা আঁকড়ে ধরে ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে জীবনের চাকা ঘুরিয়ে চলেছেন রাজশাহীর পবা উপজেলার নতুন কসবা গ্রামের ৬৫ বছর বয়সী আব্দুস সাত্তার। জীবনের ৩৫ বছর কেটে গেছে ঘোড়ার গাড়ির সঙ্গে। একসময় দিনে এক থেকে পাঁচ হাজার টাকা আয় করলেও এখন অনেক দিন ৫০০ টাকাও জোটে না।

আব্দুস সাত্তারের ঘোড়ার গাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক ছোটবেলা থেকেই। তার বাবা জর্জেস আলীও ছিলেন ঘোড়ার গাড়ির চালক। বাবার হাত ধরেই এই পেশায় আসেন সাত্তার। একসময় বিয়ে, সামাজিক অনুষ্ঠান ও মানুষের যাতায়াতে ঘোড়ার গাড়ির ব্যাপক চাহিদা ছিল। তখন এ পেশা থেকে ভালো আয়ও হতো। তবে আধুনিক যানবাহনের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে কমতে থাকে ঘোড়ার গাড়ির ব্যবহার।

সাত্তার বলেন, “একসময় দিনে এক হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করেছি। এখন অনেক দিন ৫০০ টাকাও আয় হয় না। ঘোড়ার গাড়িতে মানুষ আর তেমন ওঠে না।”

বয়সের ভারে নতুন কোনো পেশায় যুক্ত হওয়াও তার জন্য কঠিন। তাই বাবার রেখে যাওয়া পেশাকেই জীবনের অবলম্বন হিসেবে ধরে রেখেছেন তিনি।

তিনি বলেন, “আমার বাবা জর্জেস আলী ঘোড়ার গাড়ি চালাতেন। এই গাড়ি চালিয়েই আমাদের ভরণপোষণ করেছেন। তাই আমিও এই পেশায় আছি। বাপ-দাদার পেশা বলে এখনো ছাড়িনি।”

বর্তমানে পদ্মা নদীর পাড়ই সাত্তারের প্রধান কর্মস্থল। নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসা অনেকেই শখ করে ঘোড়ার গাড়িতে চড়েন। সেই আশায় প্রতিদিন ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে পদ্মার পাড়ে বসে থাকেন তিনি। কোনো দিন যাত্রী মেলে, কোনো দিন মেলে না। যেদিন ভাড়া হয়, সেদিনই কিছুটা আয় হয়।

সাত্তার বলেন, “পদ্মার ধারে কেউ ঘুরতে এলে মাঝে মাঝে ঘোড়ার গাড়িতে ওঠে। এই আশায় নদীর ধারে বসে থাকি। কোনো দিন ভাড়া হয়, কোনো দিন হয় না।”

পাঁচ সন্তান নিয়ে সাত্তারের সংসার। এই ঘোড়ার গাড়ি চালিয়েই তিন মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন তিনি। আর্থিক সংকটের কারণে ছেলেদেরও বেশি পড়াশোনা করাতে পারেননি। তারা এখন নিজেদের মতো করে আয়-রোজগার করছেন। তবে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে অল্প আয়ে সংসার চালানো দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে তার।

প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা ও আধুনিক পরিবহনব্যবস্থার প্রসারে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার বহু ঐতিহ্যবাহী পেশা। সেই তালিকায় ঘোড়ার গাড়িও এখন বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। একসময় মানুষের নিত্যদিনের চলাচলের অন্যতম মাধ্যম হলেও এখন ঘোড়ার গাড়ি অনেকের কাছে কেবল অতীতের স্মৃতি কিংবা বিনোদনের উপকরণ।

তবুও আব্দুস সাত্তারের কাছে ঘোড়ার গাড়ি শুধু একটি বাহন নয়। এটি তার পরিবারের দীর্ঘদিনের জীবিকার অবলম্বন, বাবার রেখে যাওয়া ঐতিহ্য এবং জীবনের ৩৫ বছরের সঙ্গী। আয় কমেছে, যাত্রী কমেছে, বদলে গেছে সময় তবুও পেশাটি ছাড়েননি তিনি।

পদ্মার পাড়ে প্রতিদিন ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করেন সাত্তার। হয়তো কোনো যাত্রী আসবে, কয়েকশ টাকা আয় হবে—এই আশাতেই ঘোরে তার জীবনের চাকা। ঘোড়ার গাড়ির চাকা ধীরে ধীরে ঘোরে, আর সেই চাকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন মানুষের ৩৫ বছরের সংগ্রাম, স্মৃতি ও বেঁচে থাকার গল্প।