ক্যাম্পাসের ব্যস্ততা আর কোলাহল পেরিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের পাশে এগোলেই চোখে পড়ে সুউচ্চ মিনার। পাশেই বড় গম্বুজবিশিষ্ট দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা। ভেতরে প্রবেশ করতেই নরম আলো, প্রশস্ত পরিসর আর নির্মল পরিবেশে তৈরি হয় এক প্রশান্ত আবহ। ইবাদতের পাশাপাশি ব্যতিক্রমী স্থাপত্যশৈলী ও সবুজ-স্নিগ্ধ পরিবেশের কারণে মসজিদটি হয়ে উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের অন্যতম নান্দনিক স্থাপনা। এটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ।ক্যাম্পাসের ব্যস্ততা আর কোলাহল পেরিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের পাশে এগোলেই চোখে পড়ে সুউচ্চ মিনার। পাশেই বড় গম্বুজবিশিষ্ট দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা। ভেতরে প্রবেশ করতেই নরম আলো, প্রশস্ত পরিসর আর নির্মল পরিবেশে তৈরি হয় এক প্রশান্ত আবহ। ইবাদতের পাশাপাশি ব্যতিক্রমী স্থাপত্যশৈলী ও সবুজ-স্নিগ্ধ পরিবেশের কারণে মসজিদটি হয়ে উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের অন্যতম নান্দনিক স্থাপনা। এটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ।
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ আশপাশের মানুষের ধর্মীয় চর্চার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে মসজিদটি। ইসলামি জ্ঞান, সংস্কৃতি ও চর্চার পাশাপাশি এর স্থাপত্যশৈলীও দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে। প্রতিদিন শত শত মুসল্লির পদচারণায় মুখর থাকে মসজিদ প্রাঙ্গণ।
চার দশকের পুরোনো স্থাপনা
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৭০ সালের ১৩ এপ্রিল প্রায় তিন একর জায়গায় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু হয়। তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৯৭৪ সালের মার্চে।
মসজিদের মূল কাঠামোর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ ৫২ গজ করে। ঢাকার বায়তুল মোকাররম মসজিদের নকশাপ্রণেতা ‘থারিয়ানি’র নকশার আলোকে মসজিদটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হয়। তৎকালীন সময়ে নির্মাণব্যয় ধরা হয়েছিল ৩ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। পরে কাজ শেষ করতে ব্যয় হয় প্রায় আট লাখ টাকা।
একসঙ্গে নামাজ পড়েন আড়াই হাজার মুসল্লি
মসজিদের মূল ভবনের অভ্যন্তরে প্রায় ৫০০ মুসল্লির নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে বারান্দা ও বাইরের খোলা জায়গাসহ একসঙ্গে প্রায় আড়াই হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।
মূল কাঠামোর মধ্যবর্তী স্থানে রয়েছে বিশালাকার গম্বুজ। মসজিদের অভ্যন্তরে কোনো পিলার না থাকায় এর বিশাল পরিসর আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শ্বেত-শুভ্র ঝাড়বাতি ও নান্দনিক স্থাপত্যকর্ম মসজিদের সৌন্দর্যকে করেছে আরও আকর্ষণীয়।
মসজিদের চারপাশে রয়েছে দেয়াল। আঙিনাজুড়ে সারিবদ্ধ ঝাউগাছ। দক্ষিণ-পূর্ব পাশে রয়েছে ফোয়ারা, নারী-পুরুষের পৃথক অজুখানা, অফিসকক্ষ, শৌচাগার ও ইমামের থাকার ব্যবস্থা। রয়েছে বিভিন্ন ফলের গাছ ও ঈদগাহও।
পাঠাগারেও ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা
মসজিদটির প্রতিষ্ঠাতা ইমাম ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মাওলানা জামাল উদ্দিন। বর্তমানে একজন সিনিয়র পেশ ইমাম ও একজন মুয়াজ্জিন দায়িত্ব পালন করছেন। মসজিদের সার্বিক তত্ত্বাবধানে রয়েছেন দুজন সহকারী রেজিস্ট্রার ও একজন সেকশন অফিসার।
অজুখানার পাশেই রয়েছে মসজিদের পাঠাগার। আসরের নামাজের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত এটি মুসল্লিদের জন্য খোলা থাকে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদটি অনেক সুন্দর। প্রতিদিন এখানে শত শত মুসল্লির সমাগম হয়। ক্যাম্পাসে যারা ঘুরতে আসেন, তারা একবার হলেও মসজিদটিতে নামাজ পড়ে যান। রাবি ক্যাম্পাসের অন্যান্য দৃষ্টিনন্দন স্থানের মধ্যে কেন্দ্রীয় মসজিদ অন্যতম।’
মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মো. জুনায়েদ সোবহান বলেন, ‘কেন্দ্রীয় মসজিদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম সুন্দর স্থান। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বাইরের অনেক মানুষও এখানে নামাজ আদায় করতে আসেন। ভিন্নধর্মী স্থাপত্যশৈলীর জন্য মসজিদটি বেশ পরিচিত। ইমামের সুন্দর তিলাওয়াত ও তাঁর ইমামতিতে নামাজ আদায়ের জন্যও অনেকে দূর-দূরান্ত থেকে এখানে আসেন।’
সম্প্রসারণ হচ্ছে নামাজের স্থান
মসজিদটির বর্তমান সিনিয়র পেশ ইমাম মাওলানা ফাহিম মাহমুদ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি মাদরাসা শিক্ষাও সম্পন্ন করেছেন।
মসজিদের স্থাপত্যশৈলী সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘মসজিদটির ভেতরের অংশ তুর্কি স্থাপত্যশৈলীতে নকশা করা। একসময় জুমার নামাজে প্রচণ্ড ভিড় হতো। তবে বর্তমানে শেরে বাংলা, বিজয়-২৪ ও মতিহার হলে জুমার নামাজ চালু হওয়ায় মুসল্লিদের চাপ অনেকটাই কমেছে।’
মসজিদের দু’পাশে নামাজের স্থান সম্প্রসারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সম্প্রসারিত নামাজের স্থান মূল মসজিদের সৌন্দর্যে কোনো ব্যাঘাত ঘটাবে না। বরং দূর থেকে এটি মসজিদেরই একটি অংশ মনে হবে। মূল মসজিদের সঙ্গে সমন্বয় করেই এটি নির্মাণ করা হচ্ছে।’
উচ্চ শব্দে অনুষ্ঠান, ভোগান্তিতে মুসল্লিরা
নান্দনিকতা ও ধর্মীয় চর্চার এই স্থানে কিছু সমস্যার কথাও জানিয়েছেন মুসল্লিরা। মসজিদের পাশেই রয়েছে শহীদ মিনার ও মুক্তমঞ্চ। সেখানে প্রায়ই আসর ও মাগরিবের সময় উচ্চ শব্দে মাইক ব্যবহার করে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। এতে নামাজরত মুসল্লিদের সমস্যায় পড়তে হয়।
অজু ও শৌচাগারের ব্যবস্থাও অপ্রতুল বলে অভিযোগ মুসল্লিদের। তাদের দাবি, শৌচাগারগুলোর অধিকাংশই ব্যবহারের অনুপযোগী। অজুখানায় একসঙ্গে মাত্র ৪২ জন অজু করতে পারেন। ফলে ব্যস্ত সময়ে অনেক মুসল্লিকে অপেক্ষা করতে হয়। এতে অনেকে জামাতে নামাজ আদায় থেকেও বঞ্চিত হন।
মুসল্লিদের মতে, মসজিদের ফোয়ারার চারপাশে অজুর ব্যবস্থা করা গেলে এ সমস্যা কিছুটা কমানো সম্ভব।
পাঠাগার আধুনিকায়নের দাবি
মসজিদের পাঠাগারটিকে আরও সমৃদ্ধ ও আধুনিক করার দাবি জানিয়েছেন মুসল্লিরা। বইয়ের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি অধ্যয়নের জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে আসরের নামাজের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত পাঠাগারটি খোলা থাকে। মুসল্লিদের দাবি, জোহরের নামাজের পর থেকে এশার নামাজের আগ পর্যন্ত পাঠাগারটি খোলা রাখা হোক।
এদিকে, জুমার নামাজে অতিরিক্ত মুসল্লির চাপে মসজিদের বারান্দায় নামাজ আদায়কারীদের অনেক সময় রোদে কষ্ট করতে হয়। বারান্দায় ছাদ নির্মাণ করা হলে এ সমস্যা দূর হবে বলে মনে করেন তারা।
নারীদের জন্য আলাদা মসজিদ
বর্তমানে কেন্দ্রীয় মসজিদের দক্ষিণ পাশে নারীদের জন্য আলাদা মসজিদ নির্মাণের কাজ চলছে। একই সঙ্গে উত্তর পাশে পুরুষদের নামাজের স্থানও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
ধর্মীয় চর্চার কেন্দ্র হিসেবে চার দশকের বেশি সময়ের ঐতিহ্য, ব্যতিক্রমী স্থাপত্য, সবুজ পরিবেশ ও প্রশান্ত আবহ সব মিলিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ এখন শুধু ইবাদতের স্থান নয়; এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও নান্দনিকতারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।